আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন?

আপনার হাতে থাকা টাকার মূল্য কতটা কমে গেছে জানেন?

আপনি আপনার ছোটবেলার কথা চিন্তা করুন তো। সে সময় আপনার ঈদের সালামি কত ছিল? ২ টাকা, ৫ টাকা কিংবা ১০ টাকা? এখন আপনাকে কত দিতে হচ্ছে? আরেকটু ভাবুন সেসময় আপনার বাবার আয় কত ছিল, এখন আপনার কত? তবুও কি হিমশিম খেতে হচ্ছে? মাস শেষ হওয়ার আগেই ফুরিয়ে যাচ্ছে টাকা? আপনি একা নন, প্রায়শই আশপাশের মানুষের মুখেই শুনবেন—‘টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকার আর আগের মতো মূল্য নেই।’

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো এই ‘মূল্য কমে যাওয়া’। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস’ বা ‘পার্চেজিং পাওয়ার’ কমে যাওয়া। অর্থাৎ হাতে থাকা টাকার পরিমাণ একই থাকলেও সেই টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে। আর পেছনে কলকাঠি নাড়ে ‘মূল্যস্ফীতি’।

গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের মানুষের বাস্তব আয় কমেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে অস্বাভাবিকভাবে। সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে মধ্যবিত্ত ও স্থির আয়ের মানুষ। আয় বাড়লেও ব্যয় আরও দ্রুত বাড়ছে। ফলে সঞ্চয় কমছে, ঋণনির্ভরতা বাড়ছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

সর্বশেষ এপ্রিল মাসে দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব বাজারে পড়ায় মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বেড়েছে। এতে সীমিত আয়ের ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। টানা চার মাস ঊর্ধ্বগতির পর মার্চে সামান্য কমলেও এপ্রিলে ফের বাড়ল মূল্যস্ফীতি। ফলে গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে।

১ লাখ টাকার প্রকৃত মূল্য কতটা কমেছে

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দীর্ঘ সময় মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে থাকলে টাকার প্রকৃত মূল্য দ্রুত কমে যায়। কয়েক বছর আগে ১ লাখ টাকা দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য কেনা যেত, এখন সেই একই পণ্য কিনতে অনেক বেশি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে।

যদি বার্ষিক মূল্যস্ফীতি গড়ে ৯ থেকে ১০ শতাংশ থাকে, তাহলে পাঁচ বছরে টাকার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বড় ধরনের ধাক্কা খায়। অর্থাৎ ব্যাংকে রাখা ১ লাখ টাকা সংখ্যায় একই থাকলেও বাস্তবে সেই টাকার শক্তি অনেকটাই কমে যায়।

সহজভাবে বললে, আগে ১ লাখ টাকায় যে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া যেত, এখন সেই একই জীবনযাত্রা ধরে রাখতে হয়তো প্রয়োজন হচ্ছে ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, এটি হচ্ছে “টাকার নীরব ক্ষয়”। মানুষ বুঝে ওঠার আগেই তার সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমতে থাকে।

বাজারে গেলেই বোঝা যায় টাকার মান কমেছে

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম কয়েক দফায় বেড়েছে। ২০২১ সালে যে ভালো মানের চাল ৫৮ থেকে ৬৫ টাকায় পাওয়া যেত, এখন সেই চাল কিনতে গুনতে হচ্ছে  ৮৫ থেকে ১০০ টাকা। ভোজ্যতেল, ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, সবজি—সব ক্ষেত্রেই একই চিত্র।

অনেক পরিবারের খাদ্যাভ্যাসও বদলে গেছে। আগে সপ্তাহে দুই-তিন দিন গরুর মাংস খাওয়া পরিবার এখন মাসে একবারও কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। মাছ, ফল, দুধ কিংবা পুষ্টিকর খাবার ধীরে ধীরে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

মানিক নগর এলাকার বাসিন্দা তানিয়া সুলতানা বলেন, ‘গত বছর যে খরচে সংসার চলত, এখন সেই টাকায় কিছুই হয় না। চালের দাম বেড়েছে, বাড়িভাড়া বেড়েছে, যাতায়াত খরচ বেড়েছে। মাস শেষ হওয়ার আগেই টাকা ফুরিয়ে যায়।’

আরেক বেসরকারি চাকরিজীবী আহাদ আলী বলেন, ‘আগে ৩০ হাজার টাকায় যেভাবে সংসার চলত, এখন ৫০ হাজার টাকাতেও সেই স্বস্তি নেই। মাস শেষে হাতে কিছুই থাকে না।’

মূল্যস্ফীতি আসলে কী, কেন হয়

মূল্যস্ফীতি হচ্ছে এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যখন সময়ের সঙ্গে পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে থাকে এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। সহজভাবে বললে, আজ যে টাকা দিয়ে আপনি পাঁচটি পণ্য কিনতে পারছেন, কয়েক বছর পর সেই একই টাকা দিয়ে হয়তো তিনটি পণ্যও কিনতে পারবেন না। একসময় মানুষ পকেটভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে গিয়ে ব্যাগভর্তি বাজার আনতেন। এখন ব্যাগভর্তি টাকা নিয়ে পকেটভর্তি বাজার আনতে হয়—এটাই মূল্যস্ফীতির বাস্তব চিত্র।

অর্থনীতিবিদদের মতে, মূল্যস্ফীতি বিভিন্ন কারণে সৃষ্টি হতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় কয়েকটি বড় কারণ সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে।

১. ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন: টাকার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে। বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি, ভোজ্যতেল, কাঁচামাল ও শিল্পপণ্যের বড় অংশ আমদানি করে, তাই ডলারের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাজারে।

২. উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিল্প ও কৃষি উভয় খাতেই উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ব্যবসায়ীরা সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করছেন।

৩. সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা: সংরক্ষণ সংকট, পরিবহন ব্যয় ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেক সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়। এতে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়।

৪. অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহ: অর্থনীতিতে বেশি টাকা প্রবাহিত হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সাময়িকভাবে বাড়ে। কিন্তু পণ্যের সরবরাহ সেই হারে না বাড়লে বাজারে মূল্যস্ফীতি তৈরি হয়।

৫. বৈশ্বিক অস্থিরতা: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট—এসব কারণেও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের বাজারেও।

খাদ্য মূল্যস্ফীতিই এখন সবচেয়ে বড় চাপ

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি একাধিকবার দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে শুধু অর্থনীতি নয়, সামাজিক বাস্তবতাও বদলে যায়। মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তিত হয়, পুষ্টিহীনতা বাড়ে এবং জীবনমানের অবনতি ঘটে। নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য ব্যয়ে চলে যায়। ফলে চাল, ডাল কিংবা তেলের দাম বাড়লেই তাদের পুরো জীবনযাত্রা নড়ে যায়।

অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘কোনো পরিবার যদি মাসে ৩০ কেজি চাল ব্যবহার করে এবং চালের দাম ৫০ টাকা থেকে ৬০ টাকায় ওঠে, তাহলে তাদের ব্যয় বড় আকারে বেড়ে যায়। গড় মূল্যস্ফীতির চেয়ে বাস্তবে তাদের চাপ আরও বেশি হয়।’

বেতন বাড়ছে, কিন্তু স্বস্তি নেই

সরকারি ও বেসরকারি খাতের অনেক কর্মীর বেতন কিছুটা বাড়লেও বাজারদরের সঙ্গে সেই বৃদ্ধি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে বাস্তব আয় কমে যাচ্ছে। ব্যাংকার, শিক্ষক, পোশাকশ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী—সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যদি মূল্যস্ফীতির হার বেতন বৃদ্ধির চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রকৃত অর্থে মানুষের আয় কমে যায়। কাগজে-কলমে বেতন বাড়লেও জীবনযাত্রার মান উন্নত হয় না।

সঞ্চয়েও মিলছে না স্বস্তি

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ব্যাংকে টাকা জমা রেখেও প্রকৃত মুনাফা পাওয়া যায় না। কারণ অনেক সময় ব্যাংকের সুদের হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম থাকে। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা হয় নেগেটিভ রিয়েল রিটার্ন। অর্থাৎ ব্যাংকে টাকা বাড়ছে মনে হলেও বাস্তবে সেই টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমছে। এ কারণে অনেকে সোনা, জমি, ডলার কিংবা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগে ঝুঁকছেন। তবে সাধারণ মানুষের বড় অংশের সেই সুযোগ নেই।

মধ্যবিত্ত সবচেয়ে বেশি চাপে

অর্থনীতিবিদদের মতে, উচ্চবিত্তের সম্পদ বাড়ানোর সুযোগ থাকে, নিম্ন আয়ের মানুষ কিছু সরকারি সহায়তা পায়; কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়ে। এই শ্রেণির মানুষ সামাজিক মর্যাদা ধরে রাখতে গিয়ে ব্যয় কমাতে পারে না, আবার আয়ও মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। ফলে সঞ্চয় কমে যাচ্ছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা বাড়ছে এবং মানসিক চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক পরিবার এখন সন্তানদের কোচিং বন্ধ করছে, চিকিৎসা ব্যয় কমাচ্ছে কিংবা বিনোদন খরচ পুরোপুরি বাদ দিচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি কি সবসময় খারাপ

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খুব অল্প মাত্রার মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। সাধারণত ২ থেকে ৩ শতাংশ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়তা করে। কারণ মানুষ যদি বুঝতে পারে ভবিষ্যতে দাম বাড়বে, তাহলে তারা এখনই পণ্য কিনতে আগ্রহী হয়। এতে ব্যবসা বাড়ে, বিনিয়োগ বাড়ে এবং কর্মসংস্থান তৈরি হয়।

তবে মূল্যস্ফীতি যখন দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তখন তা অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি শূন্যের নিচে নেমে গেলে বা ডিফ্লেশন তৈরি হলেও অর্থনীতি সংকটে পড়ে। কারণ তখন মানুষ খরচ কমিয়ে দেয়, ব্যবসা কমে যায় এবং কর্মসংস্থান সংকট তৈরি হয়।

ভয়াবহ রূপ ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’

বিশ্বে জিম্বাবুয়ে, ভেনেজুয়েলা, জার্মানি ও হাঙ্গেরির মতো দেশ ভয়াবহ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা পেয়েছে। জিম্বাবুয়েতে একসময় একটি রুটি কিনতে লাগত বিলিয়ন ডলার। জার্মানিতে মানুষ টাকা দিয়ে চুলা জ্বালাত, কারণ তা কয়লার চেয়েও সস্তা হয়ে গিয়েছিল। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন সেই পর্যায়ে না গেলেও দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী করা দরকার 

বিশ্লেষকদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে, বাজার তদারকি জোরদার করা; সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নত করা; কৃষি ও উৎপাদন খরচ কমানো; ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা; ডলার বাজার স্থিতিশীল করা; কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা।

একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদহার ও অর্থ সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

অর্থনীতির কঠিন এই বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই—হাতে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকার প্রকৃত মূল্য কতটুকু বাকি আছে? বাজারে গেলে, মাসের হিসাব মেলাতে বসলে কিংবা ব্যাংকের সঞ্চয়ের দিকে তাকালেই মানুষ সেই উত্তর খুঁজে পাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়; এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামের আরেক নাম।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *