দীর্ঘ দেড় দশক ধরে অভিভাবকহীন অবস্থায় চলছে যুক্তরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রে বিএনপির রাজনীতি। দীর্ঘ ১৫ বছর পার হতে চললেও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি নেই। ফলে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা, ক্ষোভ ও বিভাজন তৈরি হয়েছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে প্রবাসে রাজপথে আন্দোলন ও নির্যাতনের শিকার হলেও আজ তাদের কোনো দলীয় পরিচয় নেই।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নিউইয়র্কে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে হেনস্তার ঘটনায় বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা নিয়ে খোদ দলের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতির জন্য বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন খোকনকে দায়ী করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশ।
নেপথ্যে সমন্বয়হীনতা ও বলয় ভিত্তিক রাজনীতি:
দলীয় সূত্র জানায়, মহাসচিবকে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব আনোয়ার হোসেন খোকন নিলেও তিনি যথাযথ সমন্বয় করতে ব্যর্থ হন। এমনকি তিনি নিজে বিমানবন্দরে মির্জা ফখরুলকে রিসিভ করতে যাননি। অভিজ্ঞ ও সিনিয়র নেতাদের বাদ দিয়ে খোকনকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়ার খেসারত দিতে হচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে। নেতাকর্মীরা অবিলম্বে দেড় দশকের ত্যাগ ও পরিশ্রমের মূল্যায়নের মাধ্যমে দ্রুত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন।
নিষিদ্ধ ‘যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি’র ব্যানার:
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৭ জানুয়ারি বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির ব্যানারে কোনো কর্মসূচি পালন না করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কেউ এই ব্যানার ব্যবহার করলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এ নিয়ে প্রবাসে নেতাকর্মীদের মধ্যে তোলপাড় চলছে। নেতাকর্মীদের দাবি, তারা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করেননি, বরং দলীয় কর্মসূচি পালন করতেই এই ব্যানার ব্যবহার করছিলেন।
খোকনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ:
জানা যায়, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ১৬নং ধারা অনুযায়ী প্রবাসে সংগঠন পরিচালনার সুযোগ থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রে তা স্থবির হয়ে আছে। অভিযোগ উঠেছে, আনোয়ার হোসেন খোকন বিভিন্ন স্টেট ও মহানগর কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে চরম স্বেচ্ছাচারিতা ও স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি নিজের বলয়ের লোকদের দিয়ে পকেট কমিটি দিয়েছেন, যারা মাঠে কোনো কর্মসূচি পালনে সক্রিয় নয়। বিশেষ করে নিউইয়র্ক স্টেট কমিটি গঠন নিয়ে খোকনের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আনোয়ার হোসেন খোকন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার কোনো নিজস্ব বলয় নেই। যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ, তাই ১৮টি স্টেট কমিটি দিয়েছি। কোথাও কোনো অনৈতিক কিছু ঘটেনি।’
বিভেদের রাজনীতি ও ত্যাগীদের অবমূল্যায়ন:
যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ডা. মজিবুর রহমান আক্ষেপ করে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিগত সময়ে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। গ্রুপিং ও কোন্দলের কারণে কয়েকবার উদ্যোগ নিলেও কমিটি আলোর মুখ দেখেনি।’ জানা গেছে, ২০১৯ সালের পর আনোয়ার হোসেন খোকনকে দায়িত্ব দেওয়ার পর নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন স্টেটে আঞ্চলিকতা ও পছন্দের ভিত্তিতে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে করে কুমিল্লা, সিলেট, বরিশাল ও চট্টগ্রামের পকেট ভোটারদের প্রাধান্য দেওয়া হলেও দীর্ঘ ২০-২৫ বছর ধরে রাজনীতি করা সিনিয়র নেতাদের ঠাঁই হয়নি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতা মো. মিজানুর রহমান মিল্টন ভূঁইয়া ও সিনিয়র নেতা মোতাহার হোসেন বলেন, প্রবাসে যারা শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে সবচেয়ে সক্রিয় ছিল, তাদের ওপরই এখন উল্টো নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। দলকে শক্তিশালী করতে হলে যোগ্য ও ত্যাগীদের নিয়ে দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সময়ের দাবি।
স্থবির সাংগঠনিক কার্যক্রম:
সর্বশেষ ২০০৫ ও ২০১১ সালে আব্দুল লতিফ সম্রাট ও জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি দেওয়া হয়েছিল, যা ২০১১ সালেই ভেঙে দেওয়া হয়। এরপর ২০১৫ সাল থেকে তারেক রহমান কয়েক দফা উদ্যোগ নিলেও রহস্যজনক কারণে কমিটি হয়নি। উল্টো খোকনের হাতে দায়িত্ব যাওয়ার পর কার্যক্রম আরও স্থবির হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এদিকে আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার সব দেশের দায়িত্ব খোকনের একার হাতে থাকায় ক্ষুব্ধ দলের অন্য আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদকরাও। তাদের দাবি, অন্য যোগ্য নেতাদের কাজ করার সুযোগ না দিয়ে একজনকে সব দায়িত্ব দেওয়ায় সাংগঠনিক ক্ষতি হচ্ছে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র একজন সদস্য বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র অনেক বড় দেশ হওয়ায় স্টেট কমিটির মাধ্যমে দল চলছে। অতীত অভিজ্ঞতার কারণে সেখানে হয়তো কোনো সেন্ট্রাল কমিটি রাখা হচ্ছে না। তবে দল প্রয়োজনে যেকোনো নেতাকে যেকোনো জায়গায় দায়িত্ব দিতে পারে।’
নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, দলের হাইকমান্ড যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির গুরুত্ব অনুধাবন করে অতি দ্রুত একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করে বিদ্যমান বিশৃঙ্খলা দূর করবেন।
