টাকা নয়, বুদ্ধি খরচ করছেন নারী প্রার্থীরা

টাকা নয়, বুদ্ধি খরচ করছেন নারী প্রার্থীরা

এবারের নির্বাচনে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক দল করা নারী প্রার্থী যেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন, তেমনই একেবারে রাজনীতিতে নতুনভাবে আসা প্রার্থীও আছেন। কিন্তু উভয়ের ক্ষেত্রে প্রচারণার ধরন একইরকম। গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া প্রচারণার ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—নারী প্রার্থীরা অনেক ঘনিষ্ঠভাবে ভোটের দাবি নিয়ে হাজির হতে পারছেন। তরুণ ও নারীদের তারা খুব কাছে থেকে বুঝাতে পারছেন। বড় বড় জনসভা না করলেও ছোট পথসভাতে তারা তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। বড় দলের বড় প্রার্থীদের মতো তাদের কোনও প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি নেই। সাদাসিধা পোশাক, খুব অল্প জমায়েত আর সাবলীল ভাষায় যোগাযোগ।

এবারের নির্বাচনে নারী ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন। দেশে প্রায় অর্ধেক ভোটার নারী হলেও নারী প্রার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে এবারের নির্বাচনে। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ১ হাজার ৯৮১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে নারী প্রার্থী মাত্র ৮০ জন। অর্থাৎ মোট প্রার্থীর ৪ দশমিক ০৪ শতাংশ। এই নারী ভোটাররাই নারী প্রার্থীদের প্রধান সক্ষমতার জায়গা হয়ে উঠতে পারেন।

ঢাকার ভেতরে প্রতিটি গলিতে সাক্ষাৎ

পোস্টার, উচ্চশব্দের মাইকিং কিংবা শোডাউন—চিরাচরিত এসব নির্বাচনি প্রচারণার কৌশল এড়িয়ে এক ভিন্নধর্মী পথ বেছে নিয়েছেন ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা। মানুষের আস্থা ও ব্যক্তিগত যোগাযোগকে কেন্দ্র করে তিনি শুরু করেছেন ‘প্রজেক্ট ঢাকা-৯’ নামের নতুন ক্যাম্পেইনের উদ্যোগ। ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের সংগঠক সানজিদা ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাজধানীর মিরপুর, শাহ আলী ও দারুস সালাম এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৪ আসনে। এই প্রার্থীদের ক্ষেত্রে মানুষের সম্পৃক্ততাটাই বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল মানুষের কাছে যাওয়ার সক্ষমতার জন্য বেশ কয়েকজন নারী প্রার্থী নির্বাচনে জেতার সক্ষমতা রাখেন। তাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো (ঝালকাঠি-২), রুমিন ফারহানা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ও আফরোজা খানম (মানিকগঞ্জ-৩)। এ ছাড়া আছেন তাসলিমা আখতার (ঢাকা-১২), তাসনিম জারা (ঢাকা-৯), সানজিদা ইসলাম (ঢাকা-১৪), নাদিরা আক্তার (মাদারীপুর-১), নায়াব ইউসুফ আহমেদ (ফরিদপুর-৩), তাহসিনা রুশদীর (সিলেট-২), ফারজানা শারমীন (নাটোর-১) ও সাবিরা সুলতানা (যশোর-২)।

নারীদের প্রচারণা কৌশলের ভিন্নতা নিয়ে ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, ‘‘আসলে নারী প্রার্থী এবার এত কম এবং তথাকথিত বড় দলগুলোর নারী প্রার্থী আরও কম। ফলে আমরা যারা মাঠে আছি, তাদের টাকার বা ক্ষমতার জোর নেই। তাই বুদ্ধির জোরের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে। আমাদের প্রতিন্দ্বন্দ্বীদের অনেক রকম সামর্থ্য আছে, আমাদের টাকা খরচের সামর্থ্য নেই, তাই বুদ্ধি খরচ করি।’’

ঢাকার বাইরে প্রভাব কম না

ময়মনসিংহ জেলার ১১টি সংসদীয় আসনে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেমেছেন ৬৭ জন প্রার্থী। এই ১১টি সংসদীয় আসনের মধ্যে মাত্র দুই জন নারী প্রার্থী নির্বাচনি লড়াইয়ে টিকে আছেন।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—এই দুই জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং দুজনেরই প্রয়াত স্বামী ছিলেন নিজ নিজ এলাকার সাবেক সংসদ সদস্য। রাজনৈতিক অঙ্গনে নারীদের অংশগ্রহণ যেখানে এখনও সীমিত, সেখানে এই দুই নারী প্রার্থীর সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। স্বতন্ত্র নারী প্রার্থীরা হলেন—ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে অধ্যক্ষ আখতার সুলতানা এবং ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে হাসিনা খান চৌধুরী।

ময়মনসিংহের একজন ভোটার মিজানুর রহমান বলেন, ‘‘নারী প্রার্থীদের বড় সমাবেশ চোখে পড়েনি, কিন্তু বাড়িতে বাড়িতে অলিতে-গলিতে তাদের বিচরণ। ওনাদের ভোট একেবারেই কম হবে না।

রাজশাহীর ৩৯টি আসনে মোট প্রার্থী ২০৩ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থী সাত জন। নাটোর-১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল প্রয়াত বিএনপি নেতা ও প্রতিমন্ত্রী ফজলুর রহমান পটলের মেয়ে। তিনি নাটোর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। নাটোর-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী তাহামিদা ইসলাম তানিয়ার নির্বাচনি প্রতীক মাথাল। তাহামিদা বলেন, ‘‘নারী অধিকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কাজ করতে চাই। নির্বাচনি প্রচারণায় সাড়াও পাচ্ছি ভালো।’’ তিনি বলেন, ‘‘এটি শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং নারী নেতৃত্বের উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করার গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।’’

বরিশাল-৫ (সদর ও সিটি করপোরেশন) আসনে বিএনপির মজিবর রহমান সরোয়ার এবং ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীমের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন নারী প্রার্থী চিকিৎসক মনীষা চক্রবর্তী। এলাকার প্রত্যেকের পরিচিত মুখ। তিনি বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছেন, কথা বলছেন, সমস্যাগুলো নিয়ে নিজের পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করছেন। ঝুরি ঝুরি প্রতিশ্রুতি দেওয়ার কোন চেষ্টাও তার প্রচারণায় দেখা যায় না। তিনি সংসদে গিয়ে মানুষের দাবি তুলে ধরার প্রত্যাশা নিয়ে এগোচ্ছেন। প্রচারণা বিষয়ে জানতে চাইলে ডাক্তার মনীষা চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমরা কাজ করছি। বেশিরভাগ মিডিয়া হাউজ বড় দলের নিয়ন্ত্রণে। নারী প্রার্থীদের নিয়ে তাদের মাতামাতি অনেক কম। আসলে পুরুষের পাশাপাশি নারী প্রার্থীরা তাদের প্রচার প্রচারণায় কোনও ধরনের কমতি রাখছে না। কিন্তু পুরুষ প্রার্থীদের বিশেষ করে বড় দলগুলোর প্রার্থীদের যেভাবে মিডিয়ার কাভার করা হয়, নারী প্রার্থীদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। আমার অনুরোধ থাকবে, পুরুষ প্রার্থীর সঙ্গে নারী প্রার্থীদেরও একই মূল্যায়ন করা মিডিয়া হাউজের উচিত।’’

উল্লেখ্য, সারা দেশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ১ হাজার ৯৮১ জনের মধ্যে মাত্র ৭৩টি আসনে লড়াই করছেন ৮২ জন নারী প্রার্থী। বর্তমানে এনসিপির নারী প্রার্থী রয়েছেন মাত্র দুজন—দিলশানা পারুল (ঢাকা-১৯) ও নাবিলা তাসনিদ (ঢাকা-২০)। এবি পার্টির একমাত্র নারী প্রার্থী হলেন নাসরীন সুলতানা। তবে বিএনপি থেকে নারী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে ৯ জন। এছাড়া বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলো থেকে নারী প্রার্থী দেওয়া হয়েছে অন্তত ১৫ জনকে। জাতীয় পার্টি ১৯৮টি আসনে প্রার্থী দিলেও নারী প্রার্থী মাত্র ৫ জন। স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন ১৯ জন নারী প্রার্থী।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *